শবেবরাত আরবী শা‘বান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাত, যা উপমহাদেশে "সৌভাগ্য রজনী" নামে পরিচিত। এই রাতটি বিশেষভাবে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ধর্মীয় গুরুত্ব বহন করে, এবং এটি অনেকের জন্য এক বিশেষ রাতে পরিণত হয়, যখন তারা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং নফসের শুদ্ধি সাধন করে।
ধর্মীয় ভিত্তি:
শবেবরাত সম্পর্কিত বিভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাস রয়েছে যা মুসলিম সমাজে প্রচলিত। তিনটি প্রধান বিশ্বাস এই রাতে হয়ে থাকে:
-
কুরআন নাযিল হওয়া এবং আগামী এক বছরের তাকদীর নির্ধারণ:
- বিশ্বাস করা হয় যে, এই রাতে কুরআন নাযিল হয়েছে এবং এ রাতে বান্দার জীবনের আগামী বছরের ভাগ্য নির্ধারণ হয়। কিছু মানুষের মতে, আল্লাহ তাদের পাপ মাফ করে দেন এবং তারা নতুন বছরের জন্য একটি নতুন দিশা পায়।
-
বান্দার গোনাহ মাফ হওয়া:
- এই রাতে বান্দার গোনাহ (পাপ) মাফ হয়ে যায়, যদি তারা ইবাদত ও তাওবা করে। এই ধারণা নিয়ে অনেক হাদীস ও ইসলামি বিশ্বাস রয়েছে। যারা এ রাতে ইবাদত করেন, তাদের বিশেষভাবে মাফ করা হয় বলে বিশ্বাস করা হয়।
-
রূহসমূহের মর্ত্যে নেমে আসা:
- অন্য একটি বিশ্বাস এই যে, শবেবরাত রাতে রূহগুলি মর্ত্যে নেমে আসে। এ জন্যই মানুষ মোমবাতি, আগরবাতি, পটকা ও আতশবাজি জ্বালিয়ে থাকে, যাতে তারা এই রূহগুলির অভ্যর্থনা জানাতে পারে।
শবেবরাত ও হালুয়া রুটি:
এ দিনটি বিশেষত হালুয়া রুটি খাওয়ার জন্য পরিচিত। কিছু ইসলামি পণ্ডিতদের মতে, হালুয়া রুটি খাওয়ার পেছনে ইতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে। আল্লাহর নবী (ছাঃ) এর দান্দান মুবারক ওহোদের যুদ্ধে শহীদ হওয়ার সময় ব্যথা থেকে মুক্তি পেতে নরম খাবারের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। তখন তিনি হালুয়া রুটি খেয়েছিলেন এবং আমাদেরও সেই ব্যথা অনুভব করে ঐ খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে, এটি ঐতিহাসিকভাবে মিথ্যা এবং ধর্মীয়ভাবে অপরিপূর্ণ হতে পারে। তবে এটি ঐতিহ্য হিসেবে অনেকের মধ্যে প্রচলিত আছে।
শবেবরাতের ধর্মীয় ভিত্তি:
এ রাতের ধর্মীয় গুরুত্বের সম্পর্কে বেশ কিছু কুরআন ও হাদীস বর্ণিত হয়েছে, তবে কিছু বিতর্কিত ধারণাও রয়েছে যা ইসলামি দলিলের সঙ্গে একমত নয়।
-
কুরআন নাযিল হওয়া ও তাকদীর নির্ধারণ:
-
কিছু মানুষ বিশ্বাস করে, এই রাতে কুরআন নাযিল হয়েছিল। তবে হাফেয ইবনু কাছীর (রহঃ) তার তাফসীরে বলেছেন যে, এই রাতটি ক্বদরের রাত নয়। ক্বদরের রাত কেবল রামাযান মাসে নির্ধারিত এবং এই রাতে বান্দার ভাগ্য এক বছরের জন্য নির্ধারিত হয়, তা স্বাভাবিকভাবেই ভুল ধারণা।
-
কুরআনেও বলা আছে, "এ রাত্রিতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয়" (সূরা দুখান ৩ ও ৪ আয়াত)। তবে, এ রাত্রির জন্য যে ধারণা প্রচলিত আছে তা কেবল আংশিকভাবে গ্রহণযোগ্য।
-
-
গোনাহ মাফ হওয়া:
-
সুরা দুখান ও অন্যান্য হাদীসে কিছু মন্তব্য রয়েছে যা শবেবরাতের রাতে গোনাহ মাফ হওয়ার বিশ্বাসের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে এ বিষয়ের উপর ইসলামি পণ্ডিতদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে।
-
হাদীসে রয়েছে যে, আল্লাহ প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে নেমে আসেন এবং বান্দাদের পাপ মাফ করে দেন, যা ইবাদত ও তাওবা করে।
-
শবেবরাতের গুরুত্ব:
শবেবরাত মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য একটি রাত, যা তাদের জীবনের ভুল-ভ্রান্তি সংশোধন, ক্ষমা প্রার্থনা এবং আল্লাহর কাছ থেকে মাগফিরাত (ক্ষমা) লাভের একটি সুযোগ। এই রাতটিতে তারা নফসের শুদ্ধির জন্য নফল নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত এবং দুআ করার মাধ্যমে নিজেকে আল্লাহর কাছে সমর্পণ করে।
প্রতিদিনের তৃতীয় প্রহর:
তবে, ইসলামে যেভাবে প্রতি রাতের তৃতীয় প্রহরে আল্লাহ নিম্ন আকাশে এসে বান্দার দুআ গ্রহণ করেন, তাতে শবেবরাতের রাতে বিশেষ কিছু না হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এমনকি, যে হাদীসগুলো শবেবরাতের রাতে গোনাহ মাফ হওয়া ও তাকদীর নির্ধারণের কথা বলে, তা অনেকটাই মিথ্যা বা জাল হিসেবে পরিচিত।
উপসংহার:
শবেবরাতের রাতে নানা ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠান প্রাচীন কাল থেকে মুসলিম সমাজে চালু আছে। তবে, এটি শুধুমাত্র একটি ঐতিহ্য বা ধারাবাহিকতা হতে পারে। ইসলামী স্কলাররা এ রাতের ধর্মীয় ভিত্তি নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মতামত পোষণ করেন। তাই, শবেবরাতের রাতে ইবাদত ও তাওবার মাধ্যমে নিজেকে আল্লাহর কাছে সমর্পণ করা উচিত, কিন্তু এটি কোন বিশেষ রাত হিসাবে ভাবা বা বিশ্বাস করা উচিত নয়, যদি তা কুরআন বা হাদীসের সঙ্গতিপূর্ণ না হয়।